2:106,16:101(আয়াত বাতিল)

Parent Previous Next

কোরানের কিছু আয়াত অন্য আয়াত দিয়ে বাতিল করা হয়েছে।


জবাব:

নাসেখ মানসূখের এই কোরান বিরোধী মিথ্যা প্রথমে চালু হয় ৪০০ হিঃ বা ১০০০সনের শেষের দিকে তখনকার কিছু আলেম ওলামা কতৃক , যাদের অন্যতম আহমেদ বিন ইশাক আল দিনারি(মৃঃ ৩১৮ হিঃ), মোহাম্মদ বিন বাহার আল-আসবাহানি (মৃঃ ৩২২হিঃ) , হেবাতাল্লাহ বিন সালামাহ (মৃঃ ৪১০হিঃ) এবং মুহাম্মাদ মূসা আল-হাজমি (মৃঃ ৫৪৮ হিঃ)। তাদের দাবী , কোরানের কিছু আয়াত বাতিল বা প্রতিস্থাপিত হয়েছে কোরানের অন্য আয়াত দ্বারা। যে আয়াত অন্য আয়াতকে বাতিল করেছে , তাকে বলা হয় ‘নাসেখ’ এবং বাতিলকৃত আয়াত – ‘মানসূখ’।


আসলেই কোরানের কোন আয়াত মানসূখ বা বাতিল হয়নি এবং কোরানের দুটি আয়াতের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। অমুসলিমরা ও কোরানস্কেপ্টিকরা এই আয়াতগুলি ব্যবহার করে দুটি আয়াতের ভিতরে বিরোধ দেখিয়ে এটা প্রমান করতে যে , কোরান পারফেক্ট নয় ।


যে দুটি আয়াতের উপর ভিত্তি করে আলেমরা নাসেখ মানসুখের দাবী করেন , চলুন সেই আয়াত দুটি বিশ্লেষন করা যাক -


প্রথম আয়াত ২:১০৬

“আমি কোন আয়াত(آيَةٍ) রহিত করলে অথবা বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তার সমপর্যায়ের আয়াত আনয়ন করি। তুমি কি জান না যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর শক্তিমান?”

আলেমদের দাবী এই আয়াত প্রমান করে যে কোরানের কিছু আয়াত অন্য আয়াত দিয়ে বাতিল করা হয়েছে। তারা ‘আয়াত’ এর শব্দগত মানে করেছে কোরানের আয়াত , যদিও কোরানে আমরা ‘আয়াত’ এর ৪ রকমের শব্দগত মানে পাই।

১) ‘আয়াত’ = অলৌকিক ঘটনা (miracle)

“১৭:১০১ আপনি বণী-ইসরাঈলকে জিজ্ঞেস করুন, আমি মূসাকে নয়টি প্রকাশ্য নিদর্শন( آيَاتٍ ) দান করেছি।”

২) ‘আয়াত’ = উদাহরন (example)

“২৫:৩৭ নূহের সম্প্রদায় যখন রসূলগণের প্রতি মিথ্যারোপ করল, তখন আমি তাদেরকে নিমজ্জত করলাম এবং তাদেরকে মানবমন্ডলীর জন্যে নিদর্শন(آيَةً) করে দিলাম।”

৩) ‘আয়াত’ = চিহ্ন (sighn)

“১৯:১০ সে বললঃ হে আমার পালনকর্তা, আমাকে একটি নির্দশন(آيَةً) দিন। তিনি বললেন তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি সুস্থ অবস্থায় তিন দিন মানুষের সাথে কথাবার্তা বলবে না।”

৪) ‘আয়াত’ = কোরানের আয়াত।

“৩৮:২৯ এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি বরকত হিসেবে অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ(آيَاتِهِ) লক্ষ্য করে এবং বুদ্ধিমানগণ যেন তা অনুধাবন করে।”

এখন

২:১০৬ “আমি কোন আয়াত(آيَةٍ) রহিত করলে অথবা বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তার সমপর্যায়ের আয়াত আনয়ন করি। তুমি কি জান না যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর শক্তিমান?”

আয়াতটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে প্রতীয়মান হয় যে , এই আয়াতে ‘আয়াত’ এর মানে কোরানের আয়াত না হয়ে বাকি ৩ টি মানেই বেশি যুক্তিযুক্ত। কারন – এই আয়াতেরি কয়েকটি শব্দের দিকে খেয়াল করুন –

১) “বিস্মৃত করিয়ে দিলে”- কোরানের আয়াত বিস্মৃত হয়ে যাওয়া কিভাবে সম্ভব? বেশিরভাগ হাফেজ ভুলে গেলেও কারো না কারো তো মনে থাকার কথা , তদুপরি কোরান একবার লেখা হয়ে গেলে তো আর ভোলা সম্ভব নয়। যদি মেনেও নেই আয়াতটি বাতিল হয়ে গেছে , তবুও সেটা কোরানেই লেখা থাকবে এবং সেটা ভুলে যাওয়া কখনৈ সম্ভব নয়। অলৌকিক ঘটনা বা চিহ্ন বা উদাহরন ভুলে যাওয়া সম্ভব।

২) “সমপর্যায়ের আয়াত আনয়ন” – একটি কোরানের আয়াত বাতিল করে তারি মতো সমপর্যায়ের আরেকটি আয়াত আনয়নের মধ্যে কোন যুক্তি আছে কি? আল্লাহ কি খেলা করছেন? (আল্লাহ মাফ করুন)। বরং মূসা বা অন্য রসূলের কাছে এমন কোন অলৌকিক ঘটনা বা চিহ্ন বা উদাহরন দেয়া হয়েছিল যা মানুষ ভুলে গেলে উত্তম বা সমপর্যায়ের অলৌকিক ঘটনা বা চিহ্ন বা উদাহরন আনয়ন বেশি অর্থবহ।

৩) আপনি যদি এই আয়াতের কন্টেক্সট দেখেন অর্থাৎ আগে পিছের আয়াত পড়েন , তাহলে বুঝবেন , ২:১০৬ নং আয়াতে ‘আয়াত’ এর মানে কোরানের আয়াত নয়। এখানে ‘আয়াত’ শব্দটি দিয়ে আল্লাহর কুদরতের কথা বলা হয়েছে যা অলৌকিক ঘটনা বা চিহ্ন বা উদাহরনের সমার্থক।

আল্লাহ মানুষকে বোঝানোর জন্য যখনি কোন (আয়াতের) অলৌকিক ঘটনা বা চিহ্ন বা উদাহরনের আনয়ন করেন , তখন তা পূর্ববর্তী আয়াতের সমান বা বৃহৎ হয়ে থাকে।

“৪৩:৪৬-৪৮ আমি মূসাকে আমার নিদর্শনাবলী (بِآيَاتِنَا) দিয়ে ফেরাউন ও তার পরিষদবর্গের কাছে প্রেরণ করেছিলাম, অতঃপর সে বলেছিল, আমি বিশ্ব পালনকর্তার রসূল। অতঃপর সে যখন তাদের কাছে আমার নিদর্শনাবলী (بِآيَاتِنَا) উপস্থাপন করল, তখন তারা হাস্যবিদ্রুপ করতে লাগল। আমি তাদেরকে যে নিদর্শনই (آيَةٍ) দেখাতাম, তাই হত পূর্ববর্তী নিদর্শন অপেক্ষা বৃহৎ এবং আমি তাদেরকে শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করলাম, যাতে তারা ফিরে আসে।”


২য় আয়াত ১৬:১০১

“এবং যখন আমি এক আয়াতের স্থলে অন্য আয়াত উপস্থিত করি এবং আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেন তিনিই সে সম্পর্কে ভাল জানেন; তখন তারা বলেঃ আপনি তো মনগড়া উক্তি করেন; বরং তাদের অধিকাংশ লোকই জানে না।”

এখানে কোন আয়াতের প্রতিস্থাপনের কথা বলা হচ্ছে , তা বুঝতে হলে , এই আয়াতেরি শেষের অংশটি খেয়াল করুন – “তখন তারা বলেঃ আপনি তো মনগড়া উক্তি করেন; বরং তাদের অধিকাংশ লোকই জানে না।” এখানে এই ‘তারা’ টা কারা? যারা রসূলকে মনগড়া বা বানিয়ে কথা বলার দায়ে অভিযুক্ত করছে? এরা নিশ্চয় রসূলের অনুসারীরা না। এমন কথা মূসলমানেরা তাদের রসূলকে বলতে পারে না।

এরা হলো তারাই , যারা রসূলকে বিশ্বাস করে না এবং রসূলের কাছে নাযিলকৃত কোরানের আয়াত তাদের কাছে রক্ষিত আল্লাহর আয়াত থেকে ভিন্ন। ফলে তারা রসূলকে মনগড়া উক্তি করার দায়ে অভিযুক্ত করছে। বোঝা গেল এরা হলো আহলে কিতাবের অনুসারীরা (ইহুদী ও খৃষ্টানরা)। শুধু এই আয়াতের মাধ্যমেই নয় , অন্য আয়াতের মাধ্যমেও আল্লাহ জানিয়েছেন যে , কোরান অনুসারীদের জন্য পূর্বের রসূলগনের জন্য নাযিলকৃত কিছু কিছু আয়াত বা আইনের পরিবর্তন করেছেন। আল্লাহ কোরানে একটি আয়াতের স্থলে অন্য আয়াত উপস্থিত করলেন কিনা তা ইহুদী ও খৃষ্টানদের যেমন জানার কথা নয় , তেমনি তাদের জন্য কোন মাথা ব্যাথার কারন হতে পারেনা বা তার জন্য ক্ষেপে যেয়ে রসূলকে মনগড়া উক্তি করার দায়ে অভিযুক্ত করতে পারেনা। সর্বশক্তিমান আল্লাহ “আপনি তো মনগড়া উক্তি করেন” এই বাক্য দিয়েই বুঝিয়ে দিয়েছেন যে , এই আয়াতে কোরানের আয়াত প্রতিস্থাপনের কথা বলা হয় নি । বরং আহলে কিতাবদের গ্রন্থে যে আয়াত আছে , তার স্থলে নুতন বা উত্তম আয়াত রসূলের কাছে নাযিলের কথা বলা হয়েছে।

Created with the Personal Edition of HelpNDoc: Full-featured EBook editor