তোমাদের স্ত্রীরা হচ্ছে তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত। তাই তোমাদের শস্যক্ষেতে যাও, যেভাবে তোমরা চাও। নিজেদের জন্য আগামী দিনের ব্যবস্থা করো। আর আল্লাহর ﷻ প্রতি সাবধান! জেনে রেখো তোমরা তাঁর সামনা সামনি হতে যাচ্ছো। আর যারা পূর্ণ বিশ্বাসী হয়ে গেছে, তাদেরকে সুসংবাদ দাও। [আল-বাক্বারাহ ২২৩]


কু’রআন নারীদেরকে কতটা নিচু মনে করে  তা এই আল-বাক্বারাহ ২২৩ আয়াত থেকে বুঝা যায়!


জবাব:


নারীবাদী এবং নাস্তিকরা নানা বিকৃত উপমা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, কু’রআন নারীদেরকে কতটা নিচু মনে করে, মানুষের সমান মর্যাদা দেয় না, পুরুষদেরকে স্ত্রীদের সাথে যা খুশি করার অধিকার দেয় ইত্যাদি।


ফসল, কৃষক, রাখাল, গবাদি পশু এগুলো সম্পর্কে আজকাল আধুনিক মানুষদের এক ধরনের নিচু ধারণা জন্মেছে। কংক্রিটের জঙ্গলে বাস করা আধুনিক মানুষরা নিজেদেরকে এসব থেকে ঊর্ধ্বে মনে করেন। তারা মনে করেন: বাসে ঝুলে, গাড়িতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থেকে এক কংক্রিটের বাক্স থেকে বের হয়ে আরেক কংক্রিটের বাক্সে গিয়ে, সারাদিন কয়েদির মতো কাজ করে, তারপর ধুঁকে ধুঁকে বাসায় ফিরে আসাটা হচ্ছে অত্যন্ত সম্মানের কাজ। কিন্তু খোলা ক্ষেতে ঝির ঝির বাতাসে কাজ করা, বিশাল নদীতে নৌকা বেয়ে মাছ ধরা, সবুজ মাঠে গরু-ছাগল চরানো —এগুলো হচ্ছে যত সব অশিক্ষিত, নিচু শ্রেণীর মানুষদের কাজ।


একারণে কু’রআনে যখন কৃষক, রাখাল, শস্যক্ষেত এসবের উদাহরণ দেওয়া হয়, তারা মনে করেন কু’রআন হচ্ছে সেকেলে একটা বই, গ্রামের লোকদের পড়ার জন্য। তাদের মতো আধুনিক সমাজের মানুষের স্ট্যাটাসের সাথে এটা মানায় না। কু’রআনের নতুন ভার্শন বের হওয়া দরকার।



অথচ এই মানুষগুলো সকালের নাস্তায় যা খান, তা আসে শস্যক্ষেত থেকে, বহু কৃষকের অবদান থেকে।

* তাদের বাচ্চাদের দুধ আসে কোনো রাখালের গরুর কাছ থেকে।

* কফি আসে কোনো কৃষকের কফি ক্ষেত থেকে।

* দুপুরের লাঞ্চে মাছ-মাংস আসে জেলে, রাখালের কাছ থেকে।

* যেই চেয়ারে বসে আরাম করে কাজ করেন, সেই চেয়ারের লেদার এসেছে গরুর চামড়া থেকে, যেই গরুকে কোনো রাখাল অনেক কষ্ট করে লালন-পালন করেছে।

* যেই বিছানায় আরাম করে শুয়ে থাকেন, তার তুলা এসেছে তুলা চাষির কাছ থেকে।

* বাথরুমে গিয়ে যেই টয়লেট পেপার ব্যবহার করেন, তা এসেছে কোনো গাছের ছাল থেকে।


আধুনিক জীবনে আমরা প্রতিদিন যত কিছুই ব্যবহার করি, সবকিছুর উৎপত্তি হয় বন বা শস্যক্ষেতে, না হয় নদী-নালা-সমুদ্রে, না হয় কোনো খনিতে। যেই পেশাগুলোকে আমরা হেয় করে দেখি, সেই পেশাগুলোর উপর আধুনিক মানুষের আধুনিকতার ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে।



কেন নারীদেরকে চাষের জমির সাথে তুলনা করা হলো?


আমরা যদি স্ত্রীকে জমি এবং স্বামীকে কৃষকের সাথে তুলনা করে দেখি, তাহলে দেখবো এই উপমাটা কত সুন্দর—


একজন কৃষকের যাবতীয় চিন্তা এবং মনোযোগ হচ্ছে তার জমিকে ঘিরে। সে সারাদিন চিন্তা করে তার জমির জন্য কী করতে হবে, যেন সে ঠিকমতো ফসল পেতে পারে।

* সে প্রতিদিন যত্ন করে জমি থেকে আগাছা পরিষ্কার করে।

* জমি শুকিয়ে গেলে পানি দেয়।

* জমিতে যেন পুষ্টির অভাব না হয়, সে জন্য ঠিকমতো সার দেয়।

* তার সঞ্চয়ের একটা বড় অংশ চলে যায় জমির পেছনে।

* তারপর যখন সময় হয়, তখন সে জমিতে বীজ বুনে দেয়। তারপর থেকে শুরু হয় জমির আরও বেশি যত্ন।

* জমিতে যেন পুষ্টির অভাব না হয়, পানির অভাব না হয়, আগাছা না জন্মায়, দুষ্ট কেউ এসে জমির ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য তার ব্যস্ততার সীমা থাকে না।


 প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে তার প্রথম চিন্তা হচ্ছে জমি কেমন আছে? সারাদিন জমির জন্য কাজ করে বাসায় আসার পরেও মন পড়ে থাকে জমিতে। শেষ পর্যন্ত যখন জমি থেকে চারা বের হওয়া শুরু হয়, তখন তার খুশি কে দেখে! চারাগুলো বড় না হওয়া পর্যন্ত সেই জমির জন্য তার কত যত্ন, কত ছোটাছুটি। আর যখন ফসল কেটে ঘরে তোলার দিন আসে, সে দিনের খুশি, আনন্দ, সাফল্যের অনুভূতি যে কত তীব্র, তা শুধু একজন কৃষকই জানে।


একজন স্বামীর চিন্তা এবং পরিকল্পনার একটা বড় অংশ হচ্ছে তার স্ত্রীকে নিয়ে।

* স্ত্রীর যেন খাওয়া-পরার অভাব না হয়, সে জন্য সে সারাদিন পরিশ্রম করে।

*  স্ত্রীর অসুখ হলে ছুটাছুটি করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। যত খরচ লাগুক চিকিৎসা করায়।

* তার সঞ্চয়ের একটা বড় অংশ চলে যায় স্ত্রীর পেছনে।

* সুন্দর ভবিষ্যতের আসায় সে স্ত্রীর কাছে বীজ বুনে দেয়।

* তারপর স্ত্রী যখন সন্তান সম্ভবা হয়, তখন শুরু হয় আরও বেশি যত্ন। ঠিকমতো খাচ্ছে তো? ঠিকমতো ঘুমাচ্ছে তো? বাচ্চা যথেষ্ট পুষ্টি পাচ্ছে তো? সারাদিন অফিসে কাজ করলেও, কিছুক্ষণ পর পর ফোন করে খোঁজ নেয় স্ত্রী ঠিক আছে কিনা।

* তারপর যখন সন্তান জন্ম হওয়ার তারিখ ঘনিয়ে আসে, তখন তার খুশি দেখে কে! কত ছোটাছুটি, কত পরিকল্পনা, ফার্নিচার সরানো, ঘর গোছানো। শেষ পর্যন্ত যেদিন বাচ্চার ডেলিভারি হয়, সে দিনের খুশি, আনন্দ, সাফল্যের অনুভূতি যে কত তীব্র, তা শুধু একজন স্বামীই জানে।


স্ত্রীদেরকে শস্য ক্ষেতের সাথে তুলনা করে আল্লাহ ﷻ যথার্থই উপমা দিয়েছেন। এর থেকে সুন্দর উপমা আর কিছু হতে পারে না।

তাই তোমাদের শস্যক্ষেতে যাও, যেভাবে তোমরা চাও “যেভাবে তোমরা চাও” — এই অংশটুকুর বিকৃত অর্থ করে অনেকে দাবি করেন যে, সমকামীরা যা করে, সেরকম একটা জঘন্য কাজ কু’রআন সমর্থন করছে।


 আল্লাহ ﷻ প্রথম আয়াতেই পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন, “তোমাদের স্ত্রীরা হচ্ছে তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত।” উদ্দেশ্যই হচ্ছে শস্য উৎপাদন করা, বাচ্চার জন্ম দেওয়া। যা করলে বাচ্চা জন্ম হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, সেদিকে যাওয়ার কথা বলা হয়নি।



Created with the Personal Edition of HelpNDoc: Full-featured EBook editor