মুসলিমরা শুধু কোরআন নিয়ে পড়ে আছে!


জবাব :


ইসলামে বিশ্বাসীদের যদি জিজ্ঞেস করা হয় তারা কেন কোরআনে বিশ্বাস করে- অর্থাৎ তাদের বিশ্বাসের ভিত্তি কী? একেক জন হয়তো একেক ভাবে উত্তর দেবেন। তবে মোটামুটিভাবে নিম্নের যুক্তিগুলো চলে আসবে। কোরআন যে কোন মানুষের নিজস্ব বাণী হতে পারে না- তার স্বপক্ষে বেশ কিছু যৌক্তিক কেস দাঁড় করানো হয়েছে। যে কেউ নিরপেক্ষ মন-মানসিকতা নিয়ে কোরআন স্টাডি করলে এই সিদ্ধান্তে উপণীত হবেন যে, কোরআনের মতন একটি গ্রন্থ লিখা মানুষের পক্ষে সত্যি সত্যি অসম্ভব।

কেস-১: কোরআনই হচ্ছে একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেখানে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা নিজেই বক্তা এবং সেই সাথে বেশ কিছু আয়াতে কোরআনকে অত্যন্ত জোর দিয়ে সৃষ্টিকর্তার বাণী বলে দাবি করা হয়েছে। অতএব কোরআন খুব ভালভাবেই শর্ত-১ পূরণ করে। কিছু নমুনা: ১৪:১, ১৬:১০২, ২০:৪, ২৬:১৯২-১৯৪, ২৭:৬, ৩২:২, ৪৫:২, ৭৬:২৩, ৯৭:১, ইত্যাদি।

কেস-২: কোরআনই হচ্ছে একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেখানে কোরআনের দাবিকে ভুল প্রমাণ করার জন্য পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু ফলসিফিকেশন টেস্ট ও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে। ফলসিফিকেশন টেস্ট (৪:৮২) অনুযায়ী কোরআনে সুস্পষ্ট ভুল-ভ্রান্তি বা অসঙ্গতি পাওয়া যায় না। অতএব অনেকটা জোর দিয়েই বলা যেতে পারে যে, কোরআন দ্বিতীয় শর্তও পূরণ করে। অধিকন্তু, নিজে গ্রন্থ লিখে এভাবে চ্যালেঞ্জ দেয়াটা আদৌ সম্ভব বা স্বাভাবিক না। মানব জাতির ইতিহাসে এমন চ্যালেঞ্জ কেউ কখনো দিয়েছেন বলেও মনে হয় না। মানুষ কখনো এই ধরণের চ্যালেঞ্জ দেয় না বা দেয়ার সাহস পায় না। তাও আবার বেশ কয়েকটি ধাপে চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছে! কিছু নমুনা: ৪:৮২, ১৭:৮৮, ১১:১৩, ২:২৩-২৪, ৫২:৩৩-৩৪, ১০:৩৭, ইত্যাদি।

কেস-৩: কোরআনে বেশ কিছু ভবিষ্যদ্বাণী আছে। এ পর্যন্ত একটি ভবিষ্যদ্বাণীও ভুল প্রমাণিত হয়নি। ইতোমধ্যে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। অতএব সম্ভাবনার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ ভবিষ্যদ্বাণীগুলোও সঠিক হওয়ার কথা।

কেস-৪: কোরআনই হচ্ছে একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেখানে সেই ধর্মগ্রন্থের নাম (কোরআন), ধর্মের নাম (ইসলাম), ও অনুসারীদের নাম (মুসলিম) উল্লেখ করা হয়েছে (২:১৮৫, ৫:৩, ২:১২৮, ২:১৩১)। এই পৃথিবীর অন্য কোন ধর্মগ্রন্থে সেই ধর্মগ্রন্থের নাম, ধর্মের নাম, ও অনুসারীদের নাম পাওয়া যায় না। সবগুলো ধর্মগ্রন্থের বহিরাবরণ খুলে ফেলে ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে অজ্ঞ কাউকে যদি সনাক্ত করতে বলা হয় সেক্ষেত্রে একমাত্র কোরআনকেই সনাক্ত করতে সক্ষম হবে।

কেস-৫: কোরআনই হচ্ছে একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেখানে তার আগের রেভিলেশনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে (৫:৪৮, ৩:৩, ৩৭:৩৭, ৩৫:৩১, ১৫:৯, ১০:৩৭)- প্রচলিত কিছু বিশ্বাসকে সংশোধন করা হয়েছে (৪:১৭১, ৫:৭৩, ২১:২২, ২:১১৬, ৪:১৫৭)- এবং সেই সাথে নিজেকে ফুরকান (Criterion) হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে (২৫:১, ২:১৮৫)। নিজে একটি গ্রন্থ লিখে এভাবে ঘোষণা দেয়াটা কি সম্ভব।

কেস-৬: কোরআনের দাবি অনুযায়ী কোরআনের পান্ডুলিপি এখন পর্যন্তও সংরক্ষিত আছে (১৫:৯)। এমনকি কোরআনের একটি আয়াতের উপর ভিত্তি করে একদম শুরু থেকে হাজার হাজার মানুষ সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্তও রেখে আসছে (৫৪:১৭)। আজ-ই যদি কোন দৈব দুর্বিপাকে পৃথিবীর বুক থেকে সবগুলো ধর্মগ্রন্থ নিশ্চিহ্ণ হয়ে যায় সেক্ষেত্রে কোরআনই একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেটার প্রায় অবিকল অনুলিপি তৈরী করা সম্ভব। অবহেলা করার কোন উপায় নেই! সত্যিই একটি মিরাকল।

কেস-৭: কোরআনে প্রসঙ্গক্রমে “This is the Truth- wherein there is no doubt” কথাটি কয়েক জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে। এমনি এমনি কি কেউ এতটা জোর দিয়ে এমন কথা বলতে পারে।

কেস-৮: ভাষাসম্বন্ধীয় মিরাকল (Literary excellence and eloquence)। এমনকি কিছু ক্রিস্টিয়ান স্কলারও স্বীকার করেন। এমনও নজির আছে যে, শুধুমাত্র কোরআন তিলাওয়াত শুনেই কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করেছেন। ইউসুফ ইসলামের সবচেয়ে প্রিয় মিউজিক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে বলেছিলেন ‘কোরআন তিলাওয়াত’!

"The Quran is a miracle of purity, of style, of wisdom and of truth." – Rev. R. Bosworth-Smith

"Whenever I hear the Quran chanted, it is as though I am listening to music, underneath the flowing melody, there is sounding all the time the instant beat of a drum, it is like the beating of my heart." – A. J. Arberry

"That inimitable symphony, the very sound of which move men to tears and ecstacy." – Marmaduke Picktall

কেস-৯: কোরআনে সালভেশনের ফিলোসফি একদম স্পষ্ট ও সার্বজনিন (২:৬২, ৫:৬৯, ২২:১৭, ১০৩:১-৩)। অমানবিক বলার যেমন কারো সাধ্য নেই তেমনি আবার অবৈজ্ঞানিক বা অস্পষ্ট বলারও কোন পথ খোলা নেই। কারণ কোরআনে যেমন “অরিজিনাল সিন” বলে কিছু নেই তেমনি আবার কর্মফলের উপর ভিত্তি করে পূর্ববর্তী জীবনের পাপের ফলস্বরূপ পুনঃ পুনঃ জন্ম-মৃত্যুও নেই। প্রত্যেক শিশু নিষ্পাপ হয়ে জন্মগ্রহণ করে। শিশুরা পাপ বা অভিশাপের বোঝা মাথায় নিয়ে জন্মায় না। এর যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক কোন ভিত্তিও নেই। বরঞ্চ নবজাতক শিশুকে পাপী বা অভিশপ্ত ধরে নেয়াটা চরম অমানবিক। একটি শিশু ভাল-মন্দ বিচারের জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার আগেই যদি মারা যায় সেক্ষেত্রেও তাকে নিষ্পাপ ধরা হয়। এমনকি মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ পূর্ণবয়স্ক মানুষদেরও নিষ্পাপ ধরা হয় (২৪:৬১)। কোরআন অনুযায়ী এই পার্থিব জগৎ একটি পরীক্ষাক্ষেত্র (১৮:৭, ৬৭:২, ২:২১৪, ২:১৫৫)। প্রত্যেক বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তার স্ব-স্ব বিশ্বাস ও কর্মের জন্য দায়ি থাকবে। এক জনকে অন্য জনের পাপের বোঝা বহন করতে হবে না (১৭:১৫, ৬:১৬৪)। বিশ্বাস-অবিশ্বাস এবং সেই সাথে নিজের ভাগ্য নিজে বেছে নেয়ার জন্য মানুষকে ফ্রী-চয়েস দেয়া হয়েছে (১৭:১৫, ১৮:২৯, ৭৬:৩, ১৩:১১)। এই জগতের ভাল-মন্দ কাজ ও ফ্রী-চয়েসের উপর ভিত্তি করে পরবর্তী জগতের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। ভাগ্য তথা পরিণামও বলে দেয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সালভেশন হচ্ছে স্রষ্টার মহান একটি উপহার। তবে একদম ফ্রী-লাঞ্চ নয়! লাঞ্চের টোকেনস্বরূপ স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাসের পাশাপাশি ভাল কাজও করতে হবে (৪:১২২, ৮৫:১১, ১৮:১০৭, ১৯:৬১, ৩২:১৯, ২৯:৯, ২:১১২, ২:১৭৭)। অন্যথায় ন্যায়-অন্যায় বা ভাল-মন্দের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না!

কেস-১০: ইসলামের ইতিহাস থেকে জানা যায় মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জন্মের আগেই পিতা মারা গেছেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে মাতা মারা গেছেন। সবগুলো পুত্র সন্তান ছোট বেলায় মারা গেছেন। এমনকি একজন ছাড়া বাদবাকি কন্যা সন্তানরাও তাঁর আগে মারা গেছেন। প্রায় সারাটা জীবন সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার মধ্যে অতিবাহিত করতে হয়েছে। অথচ এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্যগুলোর কিছুই কোরআনে নেই! শুধু তা-ই নয়, তাঁর জীবনের সাথে জড়িত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যক্তিত্ব যেমন হযরত খাদিজা, হযরত আয়েশা, হযরত আবু বকর, হযরত ওমর, হযরত ওসমান, ও হযরত আলী (রাঃ) সহ আরো অনেকের জীবন বৃত্তান্ত তো দূরে থাক তাঁদের নাম পর্যন্ত কোরআনে নেই! অথচ এক পালক পুত্রের নাম সহ নাম না-জানা অনেকের নাম কোরআনে এসেছে! অতীতের অনেক ঘটনাও কোরআনে এসেছে। এমনকি যীশুখ্রিস্টের মাতা মেরির নামে কোরআনে একটি পূর্ণাঙ্গ চ্যাপ্টার আছে এবং মাতা মেরিকে নারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মানও দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রফেট মুহাম্মদের মাতা-পিতা, স্ত্রী, ও ছেলে-মেয়েদের নাম পর্যন্ত কোরআনে স্থান পায়নি! বাস্তবে আদৌ কি সম্ভব! কোরআন প্রফেট মুহাম্মদের নিজস্ব বাণী হলে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই তাঁর জীবনের কিছু স্মৃতি, হৃদয়বিদারক দৃশ্য, ও কিছু নিকটতম ব্যক্তিত্ব কোরআনে স্থান পাওয়ার কথা। অধিকন্তু, কোরআনই একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেখানে সেই ধর্মগ্রন্থের মেসেঞ্জারের বিরুদ্ধে সমালোচকদের বিভিন্ন সমালোচনা ও অভিযোগের জবাব দেয়া হয়েছে। প্রফেট মুহাম্মদকে বিভিন্নভাবে উপহাস-বিদ্রূপ করে কোরআনে কিছু আয়াতও আছে। এমনকি প্রফেট মুহাম্মদের ব্যক্তিগত জীবনের দু-একটি তিক্ত ঘটনাও কোরআনে স্থান পেয়েছে (৬৬:১, ৮০:১-৪, ৮:৬৭, ৯:৮৪, ১৬:১২৬)। কোরআনের উপর প্রফেট মুহাম্মদের হাত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচকদের উপহাস-বিদ্রূপ, অভিযোগ, ও তিক্ত ঘটনাগুলো কিন্তু সহজেই এড়িয়ে যেতে পারতেন। ফলে যে কোন যুক্তিবাদী মানুষের এখানে থেমে গিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করার কথা।

কেস-১১: হাদিসকে বলা হয় প্রফেট মুহাম্মদের নিজস্ব বাণী। কোরআনও প্রফেট মুহাম্মদের বাণী হলে হাদিস ও কোরআনের মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য থাকার কথা না। কিন্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, হাদিস ও কোরআনের বাণীর মধ্যে রাত-দিন তফাৎ (Hadith books are a living witness, which proves that the Quran is not the word of Prophet Muhammad or any other human.) অধিকন্তু, কোরআন যদি প্রফেট মুহাম্মদের নিজস্ব বাণী হতো বা প্রফেট মুহাম্মদের নামে কেউ যদি লিখতেন সেক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিকভাবেই কোরআনের “কেন্দ্রীয় চরিত্র” হতেন প্রফেট মুহাম্মদ। অথচ কোরানের “কেন্দ্রীয় চরিত্র” হচ্ছেন আল্লাহ। কোরআনে আসলে প্রফেট মুহাম্মদকে বিভিন্নভাবে আদেশ-উপদেশ দেয়া হয়েছে। তার ডজন ডজন প্রমাণ আছে। কে আদেশ-উপদেশ দিয়েছেন? আল্লাহ। কোরআনের মতন একটি গ্রন্থ লিখে কেউ কি কখনো কাল্পনিক কারো বাণী বলে চালিয়ে দিয়েছেন? ইতিহাসে এমন কোন নজির নেই! কোরআন যেভাবে লিখা হয়েছে সেভাবে আসলে সম্ভবও নয়।

কেস-১২: কোরআন যে প্রফেট মুহাম্মদ বা কোন মানুষের নিজস্ব বাণী হতে পারে না তার জ্বলন্ত একটি প্রমাণ হচ্ছে, কোরআনে যেখানে ইব্রাহীম (আঃ), ঈসা (আঃ), ও মূসা (আঃ) প্রমূখদের নাম ডজন ডজন বার উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে প্রফেট মুহাম্মদের নাম এসেছে মাত্র চার বার! প্রফেট মুহাম্মদ নিজে কোরআন লিখলে ডজনেরও বেশী নাম না-জানা ব্যক্তিত্বদের নাম ও তাঁদের বর্ণনা কোরআনে আসাটা অত্যন্ত অস্বাভাবিক, যেখানে তাঁর নিজের সম্বন্ধেই তেমন কিছু নেই এবং তাঁর জীবনের সাথে জড়িত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের নাম পর্যন্তও কোরআনে স্থান পায়নি! অপরদিকে অন্য কোন মানুষ যদি মুহাম্মদকে আল্লাহর মেসেঞ্জার বানিয়ে কোরআন লিখতেন (যদিও অসম্ভব- কারণ প্রফেট মুহাম্মদ সেই সময় জীবিত ছিলেন এবং এই অভিযোগকে কবর দেয়ার জন্য কোরআনই যথেষ্ট) সেক্ষেত্রেও খুব স্বাভাবিকভাবেই কোরআনের “কেন্দ্রীয় চরিত্র” হতেন প্রফেট মুহাম্মদ। যেমন নিউ টেস্টামেন্ট ও গীতার “কেন্দ্রীয় চরিত্র” হচ্ছেন যথাক্রমে যীশুখ্রিস্ট ও শ্রীকৃষ্ণ।

কেস-১৩: কোরআনই হচ্ছে একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেটা সেই ধর্মের প্রচারক নিজের জীবদ্বশায় এবং নিজের তত্ত্বাবধানে লিখে সমাপ্ত করে গেছেন। অপরদিকে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ কিছুটা হাদিসের মতন। অন্যান্য ধর্মের প্রচারকদের মৃত্যুর অনেক পর তাঁদের নামে ধর্মগ্রন্থ লিখা হয়েছে। কোন কোন ধর্মগ্রন্থে আবার সেই ধর্মের প্রচারককে গড বা গডের পুত্র বানিয়ে দেয়া হয়েছে।

কেস-১৪: কোরআনের অসংখ্য আয়াতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এবং সরাসরি বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও ধর্মীয় স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে (১৮:২৯, ৬:১০৪, ১০:৯৯, ১৭:১৫, ৪২:৪৮, ৬:১০৮, ৭৬:৩, ১০৯:৬, ২:২৫৬)। অন্য কোন ধর্মগ্রন্থে এভাবে সরাসরি বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও ধর্মীয় স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে বলে মনে হয় না।

কেস-১৫: কোরআনে এমন কোন শিক্ষা নেই যেটা মানবতার বিরুদ্ধে যেতে পারে। কোরআনে এমন কোন মতবাদ বা বিশ্বাসও নেই যার দ্বারা পার্থিব জগতে সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে ফায়দা লোটা সম্ভব। যেমন: জন্মান্তরবাদ ও অরিজিনাল সিন। কোরআনে এমনকি পৌরোহিত্যকেও বাতিল করা হয়েছে (৯:৩১, ৯:৩৪, ২:৪১, ২:১৭৪)। কোরআন অনুযায়ী স্রষ্টার সাথে মানুষের সরাসরি সম্পর্ক- কোনরকম মধ্যস্থতাকারী নেই।

কেস-১৬: কোরআনই সম্ভবত একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেখানে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসীদের জন্য বেশ কিছু যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে এবং সেই সাথে সমালোচকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দেয়া হয়েছে। কোরআনের স্বর ও বাচনভঙ্গীও অন্য যে কোন গ্রন্থ বা ধর্মগ্রন্থ থেকে অসাধারণভাবে আলাদা। কোরআনে মাঝে-মধ্যেই পাঠকদের প্রতি প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোন একটি বিষয়ে বর্ণনা দেয়ার পর বিশ্বাসের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এভাবে: Think ... Ponder ... Reflect ... Pay heed ... the Quran is for those who possess intelligence ... Will you not use your sense? ... Do you not understand? ... If you are in doubt, then consider this or that ... Which of the favours of your Lord will you deny? ... Will you not then believe? (২২:৫-৭, ৩:১৯০, ১০:২৪, ১৩:৩, ৩০:৮, ৩৯:২৭, ৭৫:৩-৪, ৬:৫০, ২১:১০, ২১:৩০, ২৩:১২-১৬, ৪১:৫৩, ৪৭:২৪, ৫২:৩৫-৩৬, ৫৫:১-৭৮)।

কেস-১৭: কোরআনের একটি সুরাতে সংক্ষেপে গডের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে- যাকে বলে টাচস্টোন-অফ-থিয়লজি (১১২:১-৪)। যে কোন গডের ক্ষেত্রে এই সংজ্ঞা প্রয়োগ করে দেখা যেতে পারে।

কেস-১৮: ক্রিস্টিয়ান স্কলাররা যেহেতু কোরআন নিয়ে গবেষণা করেন সেহেতু তারা কোরআন সম্পর্কে ভালভাবেই অবগত। তারা এমনকি প্রফেট মুহাম্মদকেও কোরআনের অথার মানতে নারাজ! অবস্থার উপর নির্ভর করে কখনো বলা হয় কোরআন হচ্ছে মুহাম্মদের বাণী। কখনো বলা হয় ইহুদি রাবাইদের বাণী! কখনো বলা হয় ক্রিস্টিয়ান পাদ্রীদের বাণী! কখনো বলা হয় স্যাটানের বাণী! কখনো বলা হয় ডেভিলের বাণী! কখনো বলা হয় মৃগী রোগীর বাণী! কখনো বা আবার বলা হয় মুহাম্মদের কোন এক সেক্রেটারির বাণী! তাহলে কোন্‌টি সত্য! সবগুলো তো আর সত্য হতে পারে না! মজার বিষয় হচ্ছে তারা একই সাথে সবগুলোকেই সত্য দেখতে চায়! প্রায় চল্লিশ জন অথার মিলে প্রায় পনেরশ’ বছর ধরে যেহেতু বাইবেল লিখা হয়েছে সেহেতু কোরআনের ক্ষেত্রে তারা এমনকি প্রফেট মুহাম্মদকেও একা ক্রেডিট দিতে লজ্জাবোধ করেন! মানব জাতির ইতিহাসে দ্বিতীয় কোন গ্রন্থের বিরুদ্ধে যেহেতু এরকম বিজেয়ার (Bizarre) ও র্যা ন্ডম (Random) মতামত নেই সেহেতু এ থেকে একটি বিষয় সুস্পষ্ট যে, কোরআনে মানুষের চেয়ে বড় কোন শক্তি কাজ করেছে।

কেস-১৯: অন্যান্য ধর্ম এমন কিছু আলৌকিকতা ও বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে যেগুলো ধর্মগ্রন্থ দিয়ে কোনভাবেই প্রমাণ করা সম্ভব নয় বা এমনকি যৌক্তিক কোন ভিত্তিও নেই। অন্যদিকে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস দাঁড়িয়ে আছে কোরআনের উপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ ইসলামের ভিত্তি হচ্ছে কোরআন (২৯:৫১, ৩০:৫৮), যেটা যুক্তির দ্বারা খণ্ডনযোগ্য। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের মৌলিক ভিত্তি হচ্ছে একক গড ও গডের মেসেঞ্জারে বিশ্বাস। একক গডের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করার চেয়ে বড় বোকামি আর দ্বিতীয়টি নেই। এবার প্রশ্ন হচ্ছে, গড থেকে থাকলে তাঁর পক্ষে মানুষের সাথে যোগাযোগ করাটা স্বাভাবিক ও সম্ভব কি-না। উত্তর হচ্ছে, অবশ্যই স্বাভাবিক এবং বিষয়টি বিজ্ঞানসম্মতও বটে (যেমন: বেতার তরঙ্গ)। উদাহরণস্বরূপ, জাতিসংঘের মহাসচিব ইচ্ছে করলে জাতিসংঘে বসেই বাংলাদেশের একজন মানুষের কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর বাণী পৌঁছে দিতে পারেন। অতএব “গড ও গডের মেসেঞ্জার” সম্পূর্ণ যৌক্তিক একটি বিশ্বাস।

কেস-২০: কোরআনে মানুষকে নেচার পর্যবেক্ষণের জন্য যেভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে- এই পৃথিবীর অন্য কোন ধর্মগ্রন্থে সেভাবে উৎসাহিত করা হয়নি। কোরআনের বেশ কিছু বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানের সাথে সহমতও পোষণ করে। তবে একটি গ্রন্থের কিছু বক্তব্য বিজ্ঞানের সাথে সহমত পোষণ করা মানেই কিন্তু সেই গ্রন্থটি এমনি এমনি গডের বাণী হয়ে যায় না। শর্ত-১ ও শর্ত-২ পূরণ করার পরই কেবল এই বিষয়টাকে একটি যুক্তি হিসেবে ধরা যেতে পারে।

কেস-২১: কোরআনের কিছু সাংখ্যিক মাহাত্ম্য সত্যিই আশ্চর্যজনক।

কেস-২২: কোরআন এমন একটি গ্রন্থ যেটি পড়তে গেলে পাঠকের মন কখনো স্রষ্টার দিকে...কখনো স্রষ্টার মেসেঞ্জারের দিকে...কখনো মহাবিশ্বের উৎপত্তির দিকে...কখনো মানুষের উৎপত্তির দিকে...কখনো মহাকাশ ও গ্রহ-নক্ষত্রের দিকে...কখনো আকাশ-বাতাস ও ঝড়-বৃষ্টির দিকে...কখনো নদ-নদীর দিকে...কখনো সমুদ্রের দিকে...কখনো পাহাড়-পর্বতের দিকে…কখনো গাছ-পালা-ফল-মূলের দিকে...কখনো পশু-পাখির দিকে...কখনো বিজ্ঞানের দিকে...কখনো দর্শনের দিকে...কখনো কবিতার দিকে...কখনো সাহিত্যের দিকে...কখনো ইতিহাসের দিকে...কখনো ইহুদীদের দিকে...কখনো ক্রিস্টিয়ানদের দিকে...কখনো সাবিয়ানদের দিকে...কখনো ম্যাজিয়ানদের দিকে...কখনো পেগানদের দিকে...কখনো মুসলিমদের দিকে...কখনো বিশ্বাসীদের দিকে...কখনো অবিশ্বাসীদের দিকে...কখনো সামাজিক আইন-কানুনের দিকে...কখনো অর্থনীতির দিকে...কখনো নৈতিকতার দিকে...কখনো যুদ্ধের দিকে...কখনো নামাজ-রোযার দিকে...কখনো চ্যারিটির দিকে...কখনো এতিম-বিধবাদের দিকে...কখনো মা-বাবা-ভাই-বোনের দিকে...কখনো প্রতিবেশীর দিকে...কখনো নারী-পুরুষের দিকে...কখনো বিয়ে-শাদীর দিকে...কখনো জান্নাত-জাহান্নামের দিকে...ইত্যাদি...ইত্যাদি...ইত্যাদির দিকে যাবে।

অধিকন্তু, কোরআনই হচ্ছে একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যেটিকে দেড় বিলিয়নেরও বেশী মানুষ মনে-প্রাণে এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার বাণী হিসেবে বিশ্বাস করে, যথাসাধ্য অনুসরণ করার চেষ্টা করে, এবং সেই সাথে ডিফেন্ডও করে। এমন গ্রন্থ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই!

কেস-২৩: কোরআন যে সত্যি সত্যি একটি লিভিং মিরাকল তার জ্বলন্ত একটি প্রমাণ হচ্ছে ৯-১১ নাটক। ৯-১১ নাটককে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী ইসলাম, মুসলিম, ও প্রফেট মুহাম্মদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে যে ঘৃণা-বিদ্বেষ ও অপপ্রচার চালানো হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে তা চিন্তারও বাহিরে। অথচ ৯-১১ নাটকের পর খোদ আমেরিকাতেই ইসলাম গ্রহণের হার সবচেয়ে বেশী। পাশাপাশি বৃটেন, জার্মানি, ও ফ্রান্স তো আছেই। একে মিরাকল ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়! এর একমাত্র কারণ হচ্ছে কোরআন। ৯-১১ এর মতন ঘটনাকে কেন্দ্র করে অন্য কোন ধর্ম ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ঘৃণা-বিদ্বেষ ও অপপ্রচার চালানো হলে অন্যান্য ধর্মের লোকজন কি সেই ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হবে। কোরআনের আরেকটি মিরাকল হচ্ছে, ইসলাম গ্রহণের পর অনেকেই আবার তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ইসলাম প্রচারে ব্যয় করেন। ইসলাম প্রচারে তাদের অসাধারণ দৃঢ়তা ও আগ্রহ সত্যিই অবাক করার মতন। তারা এতটাই ডিভোটেড, এতটাই প্রাউড, ও এতটাই কনফিডেন্ট যে, তাদের দেখলে জন্মসূত্রে মুসলিমরা লজ্জা পাবে! কারো বিশ্বাস না হলে কোথাও না যেয়ে শুধুমাত্র ইউটিউবে Sheikh Yusuf Estes, Dr. Gary Miller, Abdur Raheem Green, Dr. Bilal Philips, Khalid Yasin, Yusuf Islam, Yusuf Chambers, Dr. Murad Hoffman, Prof. Jeffery Lang, Hamza Yusuf Hanson, Yassir Fazaga, Abdal-Hakim Murad, Idris Tawfiq, Abdullah Hakim Quick, Malcolm X, Michael Wolfe, Dr. Ingrid Mattson, Yvonne Ridley ইত্যাদি নাম লিখে সার্চ দিয়ে তাদের লেকচারগুলো শোনা যেতে পারে। এঁরা ছাড়াও ইউটিউবে আরো অনেকে আছেন। অন্যান্য ধর্মেও কম-বেশী ধর্মান্তরিত হয়। কিন্তু ধর্মান্তরিত হওয়ার পর সেই সকল ধর্ম প্রচারের জন্য তাদের মধ্যে তেমন কোন আগ্রহ দেখা যায় না। তার মানে তারা আবেগ অথবা কোন কিছুর ফাঁদে পড়ে ধর্মান্তরিত হয়।

কেস-২৪: কোরআন বহির্ভূত প্রমাণ। তৌরাত ও ইঞ্জিলে একজন প্রফেট সম্পর্কে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী আছে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সেই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো প্রফেট মুহাম্মদ ছাড়া অন্য কারো সাথে খাপ খায় না। এমনকি কোরআনেও দাবি করা হয়েছে যে, মুহাম্মদই হচ্ছেন তৌরাত ও ইঞ্জিলে উল্লেখিত প্রফেট (৭:১৫৭, ৬১:৬)। তৌরাত ও ইঞ্জিলে সত্যি সত্যি ভবিষ্যদ্বাণী না থাকলে কেউ এমনি এমনি এভাবে দাবি করতে পারেন না নিশ্চয়।

কেস-২৫: কোরআন এমন একটি গ্রন্থ, যে গ্রন্থে অবিশ্বাস করা মানে প্রফেট মুহাম্মদকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মিথ্যাবাদী ও প্রতারক হিসেবে বিশ্বাস করা। কারণ প্রফেট মুহাম্মদ দীর্ঘ তেইশ বছরে কখনোই কোরআনকে নিজের বাণী বলে দাবি করেননি। তিনি একদম প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কোরআনকে এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার রেভিলেশন বলে দাবি করেছেন। ফলে কোরআনকে প্রফেট মুহাম্মদ বা অন্য কারো বাণী বলাটা অযৌক্তিক, অনৈতিক, এবং সেই সাথে অন্ধ-বিশ্বাসও বটে।



Created with the Personal Edition of HelpNDoc: Free EBook and documentation generator