নোবেল পুরস্কার: শুধুই 'ইহুদী বনাম মুসলিম' কেন???


জবাব:

বছর কয়েক আগে ইহুদী ও মুসলিমদের নোবেলের সংখ্যা তুলনা করে অনলাইন জগতে একটি খবর ভাইরাল হয়। সেই খবর'টা কে প্রথম ছড়িয়েছে, তার উদ্দেশ্য কী ছিল - তা জানা যায়নি। তবে ইসলাম ও মুসলিম-বিরোধীরা সেটিকে মুসলিমদেরকে হেয় করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে এভাবে:

মাত্র ১৫ মিলিয়ন ইহুদী যেখানে ১৮২-টি নোবেল পেয়েছে সেখানে ১৫০০ মিলিয়ন মুসলিম পেয়েছে মাত্র ৯-টি! অতএব, আধুনিক সভ্যতায় মুসলিমদের কোনো অবদান নেই। মুসলিমরা বিজ্ঞান-বিরোধী, পশ্চাৎপদ, ইত্যাদি। বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলার অধিকার তাদের নেই। তারা ইহুদীদের আবিষ্কৃত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। ইত্যাদি।

এ প্রসঙ্গে নিচের তথ্যগুলো সকলেরই জানা থাকা উচিত।

১. আজ পর্যন্ত শিখদের কেউ কোনো নোবেল পায়নি!

২. আজ পর্যন্ত মুসলিম নামধারী নাস্তিকদের কেউ কোনো নোবেল পায়নি!

৩. আজ পর্যন্ত বৌদ্ধদের কেউ বিজ্ঞান বা সাহিত্যে কোনো নোবেল পায়নি। শান্তিতে মাত্র দু'জন বৌদ্ধ (অং সান সু চি ও দালাই লামা) নোবেল পেয়েছে। শান্তিতে নোবেলের আসলে কোনো মূল্য নাই।

৪. এ পর্যন্ত মাত্র ৮ জন হিন্দু নামধারী নোবেল পেয়েছে।

৫. এ পর্যন্ত মাত্র ১২ জন মুসলিম নোবেল পেয়েছে।

এই যখন বাস্তবতা, তখন যারা ইহুদীদের সাথে শুধুই মুসলিমদের তুলনা করে মুসলিমদেরকে হেয় করার চেষ্টা করে তারা নিঃসন্দেহে মুসলিম-বিরোধী মৌলবাদী।

আরো মজার বিষয় হচ্ছে- তারা ইহুদী ও খ্রিস্টানদের নোবেলকে কখনো 'ইহুদী-নাসারা'দের নামে, কখনো বা আবার 'নাস্তিক'দের নামে চালিয়ে দিয়ে মুসলিমদেরকে হেয় করে! 😁

নোবেল পুরস্কার আসলে একাধিক ফ্যাক্টরের উপর নির্ভরশীল। পুরো ব্যাপারটাকে বুঝতে হলে ইতিহাস এবং সেই সাথে আরো কিছু ফ্যাক্টরকে বিবেচনায় নিতে হবে। সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা যাক।

প্রথমত – নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়েছে মাত্র ১১৮ বছর আগে তথা ১৯০১ সাল থেকে। তারও কিছু আগে থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত মুসলিমরা বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে বেশ পিছিয়ে আছে। অন্যদিকে এই সময়টাতে ইহুদীরা বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে সবচেয়ে এগিয়ে আছে। বিগত কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে একেক জাতি একেক সময়, সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে শীর্ষে ছিল। কিন্তু কোনো জাতিই তার অবস্থান বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি। ফলে ইতিহাসের বিশেষ একটি সন্ধিক্ষণ দিয়ে কোনো জাতি বা ধর্মাবলম্বীদেরকে বিচার করা অযৌক্তিক।

দ্বিতীয়ত – বিগত কয়েক শতক ধরে মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলোতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার পরিবেশ নেই বললেই চলে। এমনকি এতগুলো মুসলিম-অধ্যুষিত দেশের মধ্যে উল্লেখ করার মতো দু-চারটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণাকেন্দ্র পর্যন্ত নেই। এই অবস্থায় নোবেল আসবে কোথা থেকে? প্রকৃতপক্ষে, ইহুদী বা খ্রীষ্টান বা মুসলিম বা হিন্দু বা বৌদ্ধ বা চাইনিজ বা আফ্রিকান বা যা-ই বলা হোক না কেন – এ পর্যন্ত যাঁরা নোবেল পেয়েছেন তাঁদের প্রায় সকলেই পশ্চিমা বিশ্বের একেবারে হাতে গোনা কয়েকটি দেশের কিছু নামীদামী প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন – বিশেষ করে বিজ্ঞান-ভিত্তিক বিষয়ে।

তৃতীয়ত – যেভাবে ১৫ মিলিয়ন ইহুদীর সাথে ১৫০০ মিলিয়ন মুসলিমের পার্থক্য দেখিয়ে বিদ্বেষমূলক বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে – ব্যাপারটা যদি এই সহজ-সরল ঐকিক নিয়ম মেনে চলতো তাহলে পশ্চিমা বিশ্বের একই পরিবেশে থেকেও খ্রীষ্টানদের নোবেলের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে ইহুদীদের চেয়ে এতো কম হবে কেন?

চতুর্থত – নোবেল প্রাইজের প্রতিষ্ঠাতা যদি ইহুদী না হতেন এবং/অথবা নোবেল প্রাইজ যদি এশিয়া বা আফ্রিকা বা ল্যাতিন আমেরিকার কোনো দেশ থেকে দেওয়া হতো, তাহলে ইহুদীদের নোবেল প্রাইজের সংখ্যা অতো বেশি নাও হতে পারত – যদিও তাঁরা নামমাত্র ইহুদী।

এই হচ্ছে বাস্তবতা। তবে মজার ব্যাপার কী জানেন? ইহুদীদের মধ্যে যাঁরা নোবেল পেয়েছেন তাঁরা কিন্তু মুসলিমদেরকে হেয় করে এই ধরণের কথাবার্তা বলেন না। এই ধরণের হীন কাজের সাথে জড়িত আছে কিছু মুসলিম-বিরোধী মৌলবাদী – যাদের নিজেদেরই জ্ঞান-বিজ্ঞানে কোনো অবদান নেই!

Created with the Personal Edition of HelpNDoc: Generate EPub eBooks with ease