মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ

Parent Previous Next

আপনি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন বলে আল্লাহকে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে ওয়ার্শিপ করছেন। কিন্তু এই আপনিই যদি ক্রিস্টিয়ান পরিবারে জন্মগ্রহণ করতেন তাহলে যীশুখ্রিস্টকে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে ওয়ার্শিপ করতেন! হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করলে মা কালিকে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে ওয়ার্শিপ করতেন! ইত্যাদি! ইত্যাদি! ইত্যাদি! তাহলে আপনার দোষ বা ক্রেডিট কোথায়!

জবাব :

প্রথমত, একটা সময় আমার মনেও এই ধরণের অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খেত। কিন্তু কোরআন ও অন্যান্য ধর্ম নিয়ে স্টাডি করার পর সেই প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে বিদায় নিয়েছে। তবে আমার নিজের ক্ষেত্রে এবং অনেকের ক্ষেত্রেই এই অভিযোগ সত্য নয়। কারণ আমি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও ইসলাম থেকে বের হয়ে যেয়ে দীর্ঘদিন ধরে সবগুলো ধর্ম নিয়ে স্টাডি করে পুনরায় ইসলামে প্রত্যাবর্তন করেছি। তাছাড়াও প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ এক ধর্ম থেকে অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছে বা নাস্তিক হয়ে যাচ্ছে। ফলে একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেই যে সেই পরিবারের বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে - এই অভিযোগের যৌক্তিক কোন ভিত্তি নেই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ধরণের অভিযোগ মূলতঃ নাস্তিকদের পক্ষ থেকে আসে। কিন্তু নিজ পরিবারের বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করা যদি অসম্ভবই হবে তাহলে তারা আবার নাস্তিক হয় কীভাবে! তাছাড়া তারা কি বিজ্ঞানের আলোকে তাদের বিশ্বাসকে নিয়মিত আপডেট করছে না!

দ্বিতীয়ত, ক্রিস্টিয়ান পরিবারে জন্মগ্রহণ করলে স্বাভাবিকভাবেই বাইবেলে বিশ্বাস করতে হতো। কিন্তু বাইবেলের কোথাও যীশুখ্রিস্ট নিজেকে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা বলে দাবি করেননি বা তাঁকে ওয়ার্শিপের কথাও বলেননি। বরঞ্চ বাইবেল অনুযায়ী যীশুখ্রিস্ট নিজেই তাঁর সৃষ্টিকর্তাকে ওয়ার্শিপ করতেন। এর পরও যীশুখ্রিস্টকে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করা এবং সেই সাথে তাঁকে ওয়ার্শিপ করার মধ্যে তো কোন যৌক্তিকতা নেই। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ক্রিস্টিয়ান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও কিন্তু বাইবেল ফলো না করে অন্য কিছু ফলো করা হচ্ছে!

অনুরূপভাবে, হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করলে স্বাভাবিকভাবেই বেদ-গীতা-উপনিষদ-রামায়ণ-মহাভারত-ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থে বিশ্বাস করতে হতো। কিন্তু বেদ ও আরো কিছু ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী গডের কোন আকার-আকৃতি নেই – অর্থাৎ নিরাকার বা অদৃশ্য। অন্যদিকে আবার শ্রীরাম ও শ্রীকৃষ্ণকে মানুষ আকৃতির গড হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। এমনকি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ও শিবকেও মানুষ আকৃতির গড হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। অধিকন্তু গীতা অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণকে ওয়ার্শিপ না করলে কোন সালভেশন নেই (গীতা ৯:২৫, ১৬:১৯-২০)। ফলে পুরো ব্যাপারটাই যেখানে সাংঘর্ষিক সেখানে আবার মা কালি বা অন্য কাউকে ওয়ার্শিপের কথা আসবে কেন, সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন!

তবে কেউ না বুঝলে সেটা আলাদা (Ignorance is bliss!) কিন্তু সুস্পষ্টভাবে বুঝে যাওয়ার পরও কেউ যদি সেই বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায় তাহলে তো নিজের সাথেই প্রতারণা করা হলো। আর নিজের সাথে প্রতারণা হচ্ছে এক ধরণের অপরাধ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, যারা দিনের-পর-দিন ধরে এই ধরণের প্রশ্ন করে তারা সবকিছু বুঝে-সুঝেই করে। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করা। উদাহরণস্বরূপ, অক্সফোর্ড প্রফেসর রিচার্ড ডকিন্সের মত যে কারো নিশ্চিতভাবেই জানা উচিত যে, যীশুখ্রিস্ট অন্ততঃ এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা হতে পারেন না। এমনকি বাস্তবে ট্রিনিটি’র মত কোন কিছুর অস্তিত্বও থাকতে পারে না। এর পরও প্রফেসর ডকিন্সের মত কেউ এই ধরণের বোকা-সোকা ও ছেলেমি-মার্কা প্রশ্ন করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলে সেটা হবে অপরাধ। অনুরূপভাবে, মনা-তাবিজ ব্যবসায়ীরা কখনো স্বনামে কখনো বা আবার মুসলিম নাম নিয়ে বছরের-পর-বছর ধরে বিভিন্ন লেবেলের আড়ালে আমজনতাকে যেভাবে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সেটা আরও বড় ধরণের অপরাধ।

তৃতীয়ত, ইসলামে প্রফেসর ডকিন্স ও ঢাকার রাস্তার একজন টোকাইকে এক পাল্লায় বিচার করা হবে না। প্রত্যেক মানুষকে নিজ-নিজ বিশ্বাস ও কর্ম অনুযায়ী বিচার করা হবে (কোরআন ২:৬২, ৫:৬৯, ২২:১৭, ২:১১১-১১২, ২২:৬৭, ইত্যাদি)।

কেউ ইহুদী বা ক্রিস্টিয়ান বা হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও জান্নাতে যেতে পারে। অন্যদিকে আবার কেউ মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও হয়ত জাহান্নামে যেতে পারে। যেমন মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও কেউ কেউ দেখা যাচ্ছে নিজেদেরকে ‘এক্স-মুল্লা’ বা ‘এক্স-মুল্লানী’ ঘোষণা দিয়ে একদিকে যেমন স্ব-ইচ্ছায় জাহান্নামকে বেছে নিয়েছে অন্যদিকে আবার প্রভুদের দাসত্বপনাও শুরু করেছে। ফলে এই ধরণের প্রশ্ন বা অভিযোগের আসলে কোন যৌক্তিকতা নেই। অতএব ‘মাদার তেরেসার মত কেউ জাহান্নামে যাবে কীভাবে!’ আর ‘বিন লাদেনের মত কেউ জান্নাতে যাবে কীভাবে!’ – এই ধরণের প্রশ্ন করে নিজেকে বোকা না বানিয়ে নিজের চরকায় তেল দেয়াই মনে হয় বুদ্ধিমানের কাজ হবে!

Created with the Personal Edition of HelpNDoc: iPhone web sites made easy